যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সর্বশেষ বৈঠকে সুদহার না কমিয়ে অপরিবর্তিত রেখেছে। গত বুধবারের ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি দেশটিতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া চলতি বছর ও ২০২৬ সালের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করেছে ফেড। খবর এপি।
আমদানি পণ্যে শুল্ক আরোপ হলে সাধারণত পণ্যমূল্য বেড়ে যায়, এর প্রভাবে বেড়ে যায় মূল্যস্ফীতিও। সাধারণত মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সুদহার উচ্চস্তরে রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে কভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে দীর্ঘ সময় এ প্রক্রিয়া অনুসরণের পর সম্প্রতি কয়েক দফা কমানো হয়েছিল সুদহার। এখন ট্রাম্পের শুল্কনীতি মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের ওপর প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে।
ফেডের নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আগের দেয়া পূর্বাভাসের তুলনায় ধীর হবে। ২০২৫ সালে প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসবে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২ দশমিক ৮ এবং আগামী বছর হবে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বর্তমানে ২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকলেও চলতি বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। মূল্যস্ফীতির দুই হারই ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি।
সর্বশেষ বৈঠকে অপরিবর্তিত রাখলেও চলতি বছরে দুবার সুদহার কমানোর পূর্বপরিকল্পনা বহাল রেখেছে ফেড। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নীতিনির্ধারকদের মনোভাব ইঙ্গিত দেয় যে তারা দীর্ঘ সময়ের জন্য সুদহার অপরিবর্তিত রাখতে পারেন। এ বিষয়ে মরগান স্ট্যানলির অর্থনীতিবিদ মাইকেল গ্যাপেন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি স্থির থাকলে ফেডের জন্য এ বছর সুদহার কমানো কঠিন হবে।’
ফেডের ১৯ কর্মকর্তার মধ্যে আটজন চলতি বছর একবার অথবা একবারেই সুদহার না কমানোর পক্ষে। ডিসেম্বরে এমন কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল মাত্র চার।
ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং এটি ২০২২ সালের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে ফেডের অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা মূল্য স্থিতিশীলতার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিলাম। আমি একে চূড়ান্ত বলে মনে করি না। তবে শুল্কজনিত মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তী অগ্রগতি কিছুটা দেরি হতে পারে।’
এদিকে ফেডের বৈঠকের পর রাতে ট্রুথ সোশ্যাল প্লাটফর্মে ডোনাল্ড ট্রাম্প লেখেন, ‘মার্কিন অর্থনীতিতে শুল্কজনিত রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে সুদহার কমানো উচিত হবে ফেডের। সঠিক কাজটি করুন।’
জেরোম পাওয়েল আরো জানান, ফেড এখনো আশা করে আগামী বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতি প্রায় ২ শতাংশে নেমে আসবে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, শুল্কের কারণে এককালীন মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা তৈরি করবে না। কিছু ক্ষেত্রে ফেড সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি ‘অগ্রাহ্য’ করতে পারে এবং সুদহার বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও স্বীকার করে নেন তিনি।
ফেড চেয়ারম্যানের বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছে, যার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে। বুধবার বিকাল এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের ১ শতাংশ ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।
আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান উইলমিংটন ট্রাস্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ লুক টিলি বলেন, ‘ফেডের জানুয়ারির সভার তুলনায় পাওয়েলের শুল্কসংক্রান্ত উদ্বেগ কমে এসেছে। তারা এখন শুল্ক নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কথা বলছেন।’
ফেডের পূর্বাভাস অনুসারে, বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বর্তমানে দেশটিতে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশ, যা স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে।
এ পূর্বাভাস দেখাচ্ছে, ফেড কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। সাধারণত উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সুদহার বাড়ানো বা উচ্চ স্তরে রাখা হয়। আবার ধীর প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বেকারত্বের সময় সুদহার কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা হয়।
এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বেঞ্চমার্ক সুদহার প্রায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশে অপরিবর্তন রেখেছে ফেড। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলে তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাস অনুসারে, শুল্কের কারণে মূল্যস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। তবে বিভিন্ন ধরনের নীতি শিথিলায়ন ও খরচ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো যেতে পারে।
জেরোম পাওয়েল স্বীকার করেছেন, বিভিন্ন ব্যবসা ও ভোক্তা জরিপে অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তবে বেকারত্বের হার এখনো কম ও অর্থনীতির সম্প্রসারণ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বুঝি, জনগণের আস্থা অনেকটা কমে গেছে। তবে অর্থনৈতিক কার্যক্রম মজবুত রয়েছে। অর্থনীতি এখনো সবল বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি আরো জানান, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা ‘অস্বাভাবিকভাবে বেশি’ এবং ফেড ধৈর্য ধরে পরিস্থিতির বোঝাপড়ায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। তিনি বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়ো করব না। এমন অবস্থানে আছি যে আমরা পরিষ্কার তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি এবং কোনো তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই।’
এদিকে ট্রেজারি বন্ড হ্রাসের গতি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে ফেড। আগে তারা প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ট্রেজারি বন্ড পরিশোধ করত, যা এখন কমিয়ে ৫০০ কোটি ডলার করা হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সুদহার কিছুটা কম থাকতে পারে। পাওয়েল এটিকে কারিগরি পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সুদহার নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।